গদ্য উদ্ভবের প্রারম্ভেই উপন্যাসের জন্ম। যন্ত্রযুগের প্রভাব মানুষের যান্ত্রিক জীবনের গরজেই উপন্যাসের রূপকল্প নির্মিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ছন্দোবদ্ধ, পদ্যময় সাহিত্যের স্থলে উপন্যাস মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ গাদ্যিক ক্যানভাস নিয়ে আবির্ভূত হয়। বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও হ্যানা ক্যাথারিন ম্যালেন্স উপন্যাস লেখার প্রচেষ্টা করলেও প্যারিচাঁদ মিত্রই বাংলা উপন্যাস শিল্পে প্রথম ঔপন্যাসিক হিসেবে...
আরো পড়ুন
গদ্য উদ্ভবের প্রারম্ভেই উপন্যাসের জন্ম। যন্ত্রযুগের প্রভাব মানুষের যান্ত্রিক জীবনের গরজেই উপন্যাসের রূপকল্প নির্মিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ছন্দোবদ্ধ, পদ্যময় সাহিত্যের স্থলে উপন্যাস মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ গাদ্যিক ক্যানভাস নিয়ে আবির্ভূত হয়। বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও হ্যানা ক্যাথারিন ম্যালেন্স উপন্যাস লেখার প্রচেষ্টা করলেও প্যারিচাঁদ মিত্রই বাংলা উপন্যাস শিল্পে প্রথম ঔপন্যাসিক হিসেবে অভিধা পান। ভবানীচরণের নববাবু বিলাস ও কলিকাতা কমলালয়’র ভাষা গদ্য হলেও মধ্যযুগের কাব্যময় ভাষার প্রভাব থেকে পবিত্রাণ পায়নি। (পববর্তী পর্যায়ে আমরা দেখব বঙ্কিমচন্দ্রও এই অনুযোগ থেকে মুক্তি পাননি) হ্যানা ক্যাথারিন ম্যালেন্সের ফুলমনি ও করুণার বিবরণ উপাখ্যানটিতে উপন্যাসের করণকৗশল অনুপস্থিত। লেখিকা প্রতিবেদনের মতন কাহিনি বর্ণনা করে গেছেন। ফলে কাহিনির কার্যকারণ ও চরিত্রের সঙ্গে কাহিনির সংশ্লিষ্টতা না থাকায় উহা প্রতিবেদন হয়ে উঠেছে। এদিক থেকে প্যারিচাঁদ মিত্রই অগ্রগামী। তবে প্যারিচাঁদের উপন্যাসে সমাজের কুরুচি ও অসঙ্গতির চিত্র প্রতিভাত হওযায় তা হয়ে উঠেছে নকসা জাতীয় রচনা। বাাংলা উপন্যাস শিল্পে প্রথম ঔপন্যাসিক হওয়ার গৌরব প্যারিচাঁদ মিত্রেরই। তিনি মূলত তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতা অঙ্কনের দিকেই ঝুঁকেছিলেন বেশি। ডিরোজিওর ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি পাশ্চাত্য প্রভাবে প্রভাবিত হননি। প্যারিচাঁদের আলালের ঘরের দুলাল নকসা জাতীয় রচনা হলেও তিনি সমাজের পূর্ণাঙ্গ রূপ অঙ্কন করেছেন, তা না হলে আমরা এ উপন্যাস সমাজের বহির্দৃশ্য অবলোকন করার পাশাপাশি গার্হস্থ্য জীবন দর্শন করতে পারতাম না।
বাংলা উপন্যাসে সাহিত্যে সার্থক উপন্যাস লেখার গৌরব বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের। তিনি সমসাময়িক জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে ইতিহাসের কাহিনিতে মিশিয়ে দিয়ে রোমান্সধারার শিল্প রচনা করেছেন। ব্রিটিশ সরকারের আমলা হওয়ায় শিল্পের ক্যানভাসে সরাসরি কথা বলা তারপক্ষ্যে প্রায় কষ্টসাধ্য ছিল। এই কারণে তিনি ইতিহাসকেই প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে সমকালীন জীবন ও সমাজবাস্তবতাকে ন্যায় নীতির ফ্রেমে বন্দি করে সৃষ্ট নরনারীকে বিচিত্রভাবে রূপায়ণ করেছেন।
বঙ্কিমের পর বিস্ময়কর শিল্পপ্রতিভা নিয়ে বাংলা উপন্যাসে আর্বিভূত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বঙ্কিমের থেকে একধাপ এগিয়ে জীবনের ‘আঁতের ঘরের কথা’ কে উপন্যাসের বিষয় ও উপকরণ করেন। বঙ্কিমের ন্যায় তিনি রোমান্সের ব্যাপ্ত জগতে বিরচন করলেন না, সমাজকে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে ব্যবচ্ছেদ করলেন। মানব মনের গহীনে প্রবেশ করলেন, গহীনতর স্তরে গিয়ে তুলে আনলেন মানবচরিত্রের রহস্য। নারী মনের বিচিত্রভাবনা, নারী চরিত্রের রহস্য, নারীর রূপসৌন্দর্য; তা প্রতিস্থাপন করলেন শিল্পের ক্যানভাসে। সমকালীন রাজনীতি, নারী পুরুষের মধ্যকার বিভেদ, দাম্পত্য সংকট, চিরায়ত সৌন্দর্যচেতনা তাঁর উপন্যাসে শিল্পসফতায় চিত্রিত। কম বয়সে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস লিখলেও তিনি প্রথম পর্যায়ের লেখাগুলোকে শিল্পজ্ঞান করেননি। বিষয়টিকে বড় শিল্পীর বিনয় হিসেবে গ্রহণ করে থাকি। তাঁর বৌঠাকুররাণীর হাট, ও বাজর্ষি উপন্যাস দুটি বঙ্কিমের আদলে রোমান্সময় কাহিনি নিয়ে রচিত। প্রথম পর্যায়ের রচনায় বঙ্কিমের প্রভাব এড়াতে সক্ষম না হলেও পরবর্তী পর্যায়ে রবি ঠাকুর উপন্যাসশিল্পে নিজস্ব ফর্ম, চরিত্রায়ন, প্লটবিন্যাসরীতি ও ভাষারীতি আনয়নে বিস্ময়করভাবে সফল হন।
শরৎ বাংলাকথাসাহিত্যে অপরাজেয় কথাশিল্পী। সমাজের অন্যায় অনাচার, কুসংস্কার ও নারী পুরুষের অন্তর্লীন হৃদয়ের প্রকাশ, নারীর লাঞ্ছনা-বঞ্চনা তাদের দ্রোহদৈন্যতা প্রভূতি তাঁর উপন্যাসে শিল্পসফলতায় চিত্রিত। শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। রবীন্দ্রযুগে জন্মগ্রহণ করেও তিনি আবহমান বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষি মানুষের হৃদয়ে কেড়েছিলেন জীবনের গল্পসৃজনের জাদুস্পর্শে।
বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে গ্রামীণ জীবনের রূপ নেই বললেই চলে। তিনি ইতিহাসের বিস্তৃত ক্যানভাসে, উদার আকাশের নিচে বিচরণ করে মূলত ইতিহাস ও রোমান্সের বৃত্তেই ঘুরপাক খেয়েছেন। তাঁর পরবর্তী শিল্পপুরুষ ররীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদার শ্রেণি ও মধ্যবিত্তের বলয়েই অবস্থান করেছেন। কবিতায় ছোটগল্পে গ্রামীণজীবন ও সাধারণ মানুষের কথা, ব্যথা অনুভব করলেও উপন্যাসে ররি ঠাকুর জমিদার ও মধ্যবিত্তশ্রেণিকেই চিত্রিত করেছেন। শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বহমান সময় ও সমাজের অন্যায় অনাচার কুরীতি, কুরুচি শিল্পসফল ভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। এঁদের কথাসাহিত্যে নিম্নবর্গ উপেক্ষিত। বেগম রোকেয়া ও নজিবর রহমান অপেক্ষাকৃত সাধারণ মানুষের কথা বলতে চেষ্টা করলেও তারাও মধ্যবিত্তের বলয়ে অবস্থান করেছেন। একমাত্র ত্রিশোত্তের কথাসাহিত্যেই নিম্নবিত্তকে অনুপুঙ্খ চিত্রিত হতে দেখা যায়। সময় ও সমাজবাস্তবতায় নিম্নবিত্ত সাহিত্যে জায়গা করে নেয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযু্েদ্ধর মধ্যবর্তী পর্যায়ে সারা বিশ্বব্যাপি কম-বেশি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি বিষয়গুলো মাথা চাড়া দিতে থাকে। সারা বিশ্বব্যাপি অস্থির উন্মাদনা, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়টি নিয়ে শিল্প রচিত হলেও নিম্নবিত্ত থাকে উপেক্ষিত। এসব অবহেলিত মানুষদের নিয়ে প্রথমবারের মতন কলম ধরেন বিভূতিভূষণ। তিনি প্রকৃতি ও জীবনকে অবিচ্ছেদ্য সত্তা গ্রথিতসূত্রে নিম্নবিত্তকে প্রকৃতির সন্তান হিসেবে আনয়ন করেন। পথের পাঁচালী বিভূতিভূষণের প্রথম উপন্যাস।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা কথাসাহিত্যে একটি নাম। কবিতার মধ্য দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে তার অনুপ্রবেশ হলেও পরবর্তী পর্যায়ে তিনি কথাসাহিত্যেকেই শিল্প সাধনার মাধ্যম করেন। তাঁর উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য গ্রামীণ জনজীবন ও জাতিসত্তার গভীরের প্রোথিত চেতনার নবরূপায়ণ। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারা তার কথাসাহিত্যে আবিভূর্ত হয়েছে মানুষের চেতনালোকের শক্তি হিসেবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও আভিজাত্যের তোড়ে পুরনো সংস্কৃতির বিপন্নতার যে আশঙ্কা তা চিত্রায়ণ দেখা যায় তার উপন্যাসে।
ত্রিশোত্তর কথাসাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বতন্ত্র শিল্পমেধা ও মনন নিয়ে আবির্ভূত হন। ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন ও মার্কসীয় জীবনচেতনায় মানিক মূলত বৈজ্ঞানিক মানুষকেই চিত্রিত করেন তাঁর উপন্যসে।
বাংলা উপন্যাসশিল্পে প্রথম নিরীক্ষাপ্রবণ ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্্। তিনি মানুষের মনোজগতের রহস্যস্তরের কথাগুলো কখনো অস্তিত্ববাদী জীবনদর্শনে, কখনা চেতনাপ্রবাহরীতিতে বর্ণনাসূত্রে তাঁর শিল্পসৃজন করেছেন। উপন্যাস, গল্প ও নাটকÑ এই ত্রিধারা সাহিত্য নির্মাণে তিনি বিষয়বৈচিত্র্যে ও প্রকরণগত স্বতন্ত্র নিমার্ণকলার নিরন্তর নিরীক্ষাকর্মী। সাহিত্য জনমানুষকে শুদ্ধ সত্তায় উত্তীর্ণ করেÑ এই জীবনবোধে উজ্জীবিত হয়ে তিনি সাহিত্য নির্মাণ করেছেন। ফলে মঙ্গল, কল্যাণকর ও প্রকরণগত নিরীক্ষাপ্রবণ সাহিত্য রচনা করায় তাঁর সাহিত্য পাঠকের জন্য যেমন তেমনি একাডেমিকভাবে আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার যে গল্প, উপন্যাস ও নাটকগুলো পাঠ্যভুক্ত সেগুলো আলোচনার পাশাপাশি তার জীবন ও কর্ম নিয়ে নাতিদীর্ঘ আলোকপাত আছে এই গ্রন্থে।
এই গ্রন্থে পূর্ণাঙ্গ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্্কে চিত্রায়ণ ও তাঁর শিল্পের বিষয়-বৈচিত্র্য ও প্রাকরণিক নিরীক্ষাকৌশল পাঠকের মনোজগতে সঞ্চারণে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রন্থটি পঠনে পাঠক, গবেষক ও অধ্যাপকগণ সামান্যতম উপকৃত হলে আমার শ্রম সার্থক হয়েছে বলে আত্মপুলকে শান্তি পাব।
কম দেখান