দর্শন-দারিদ্র্যের এ দেশে বাউল ও তার সমানধর্মা লোকায়ত ভাবসাধনার মরমী পুরুষেরাই এক অর্থে দর্শনচিন্তার জনক ও প্রচারক। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে এক ভিন্নতর উপলব্ধি তাঁদের সাধনার ভুবনকে করেছে অভিনব বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত। প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ও শাস্ত্রাচারের আনুগত্য তাঁরা কখনো স্বীকার করেন নি, অনিবার্যভাবেই শাস্ত্রশাসিত অনুদার সমাজের নিগ্রহ-নির্যাতন বরণ করতে হয়েছে তাঁদের।
লালন...
আরো পড়ুন
দর্শন-দারিদ্র্যের এ দেশে বাউল ও তার সমানধর্মা লোকায়ত ভাবসাধনার মরমী পুরুষেরাই এক অর্থে দর্শনচিন্তার জনক ও প্রচারক। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে এক ভিন্নতর উপলব্ধি তাঁদের সাধনার ভুবনকে করেছে অভিনব বৈশিষ্ট্যে মণ্ডিত। প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ও শাস্ত্রাচারের আনুগত্য তাঁরা কখনো স্বীকার করেন নি, অনিবার্যভাবেই শাস্ত্রশাসিত অনুদার সমাজের নিগ্রহ-নির্যাতন বরণ করতে হয়েছে তাঁদের।
লালন সাঁই (১৭৭৪-১৮৯০) ছিলেন এ বাউল সম্প্রদায়ের প্রধান পুরুষ। এ লোকোত্তর মরমী সাধকের সংগীত, সাধনা ও দর্শন গ্রামীণ জনপদের গণ্ডি অতিক্রম করে নাগরিক জীবনকেও স্পর্শ করেছে। রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বজনীন প্রতিভা-পুরুষও তাঁর প্রতি অনুরক্ত ও মনোযোগী হয়েছিলেন। লালনের নাম আজ দেশের পরিধি অতিক্রম করে বিদেশের মাটিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। একজন গ্রাম্য নিরক্ষর সাধকের এ অর্জন ও প্রতিষ্ঠা স্বভাবতই বিস্ময় জাগায় মনে।
লালন ছিলেন গানের মানুষ। সে গান সম্প্রদায়ের দীক্ষিতজনের কাছে সাধনার গূঢ় রহস্য প্রকাশের জন্যেই মূলত রচিত হয়েছে। কিন্তু এ প্রয়োজন ছাপিয়ে তাঁর গানের ভাব-ভাষা-ভাবনায় এমন মেধাবী বক্তব্য, আকর্ষণীয় অলঙ্কার ও চেতনার ঐশ্বর্য প্রচ্ছন্ন ছিল, তা সম্প্রদায় বহির্ভূত সুধীজনকে কেবল আকৃষ্ট ও মুগ্ধই করে নিÑপ্রাণিতও করেছে। সেসব গান কালান্তরেও মানুষকে আনন্দ দান করে চলেছে লাভ করেছে সংগীত-সাহিত্যের মর্যাদা।
আত্মনিমগ্ন লালন দেহকেন্দ্রিক সাধনপথের মরমী পথিক হলেও সমাজবিচ্ছিন্ন ছিলেন না। সামাজিক ভেদনীতি, শ্রেণী-বৈষম্য, বর্ণ শোষণ, জাতপাতের কলহ, সামন্ত-নিগ্রহ ও সাম্প্রদায়িক বিরোধের বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। সমাজ-ইতিহাসের ধারায় বিচার করলে বলা চলে, গ্রামবাংলার মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন লালন সাঁই। মানুষসত্যে’র এ উপাসক ধর্ম কিংবা শাস্ত্র নয়, মানুষকেই প্রাধান্য দিয়েছেন মানবগুরুকেই আরাধ্য বিবেচনা করেছেন। মানুষের প্রতি মানুষের শোষণ-বঞ্চনা-অবিচার-অবজ্ঞার চির অবসান কামনা করে সমাজমনস্ক সাধক লালন শ্রেণীহীন শোষণমুক্ত এক অভিনব মানবসমাজের স্বপ্ন দেখেছেন।
লালন সত্য-সুন্দর-কল্যাণ-আনন্দের সমন্বয়ে জীবনকে দিতে চেয়েছিলেন এক নতুন তাৎপর্য। কিন্তু কাল ছিল বিরোধী, ফলে তার স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূর্ণ হতে পারেনি অশুভ শক্তির প্রতিক্রিয়ায়। তাই তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে, ‘রাখলেন সাঁই কূপজল করে আন্ধেলা পুকুরে। / কবে হবে সজল বরষা, রেখেছি সেই ভরসা’। যার বেগবান স্রোতস্বতী হওয়ার কথা ছিল, সে কিনা হয়ে রইলো সীমিত জলের নিস্তরঙ্গ আঁধার। বৈরী সমাজ ও প্রতিকূল সময় তাঁর বিকশিত হওয়ার পথে অন্তরায় হয়েছিল, তাই শোনা যায় হাহাকারে দীর্ণ তাঁর অন্তরের বেদনা : এ দেশেতে এই সুখ হলো আবার কোথা যাই না জানি। / পেয়েছি এক ভাঙা নৌকা জনম গেল ছেঁচতে পানি ॥’ তবু তিনি মানুষের প্রতি কখনো বিশ্বাস হারাননি, ‘মানুষ অবিশ্বাসে পাইনে রে সে মানুষ নিধি’। ইহজাগতিকতায় আস্থাবান এ সাধক পূর্বাপর মর্ত্যরে মানবজীবনের মধুময় অস্তিত্বেরই অর্চনা করেছেন; ‘এমন মানব-জনম আর কি হবে। / মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে’।
এ বহুমাত্রিক লালন তাঁর গানের সম্মোহনে তত্ত্ব-দর্শন-সাধনার আকর্ষণে মানুষকে তাঁর কাছে নিত্য-নিয়ত টেনে এনেছেন। অনুরাগমুগ্ধ মানুষ মরমী চেতনায় নিজেকে সম্পূর্ণ করেছেন এ সাধকের কাছে। এক গভীর উপলব্ধি ও প্রশান্তির তৃপ্তি জেগেছে তাঁদের অন্তরে। লালনমগ্ন এমনই একজন অনুরাগীর নাম আজাদুর রহমান। অতি স্বল্প সময়েই লালন পেয়েছেন এ অনুরাগীর ভক্ত-হৃদয়ের অর্ঘ্য।
আজাদুর রহমানের লালন উপলব্ধি ও চর্চার স্বাক্ষর রয়েছে তাঁর প্রথম বই-‘লালনের গান’ (২০০৯)-এ। এ বই শুধু লালনের গানের সংকলনমাত্র নয়, এতে সমকালীন লালনপন্থী ফকির-বাউলদের সংক্ষিপ্ত অথচ নিবিড় পরিচয়ের বিবরণও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এরপর আজাদ থেমে থাকেন নি লালনের গান ও তত্ত্ব-দর্শনের আরো গভীরে প্রবেশের প্রয়াস পেয়েছেন তার অন্তরঙ্গ পরিচয় মিলবে তাঁর বর্তমান ‘লালন মত লালন পথ’ বইয়ে। ‘সাধুর বাজার কি আনন্দময়’ তারই ভাষ্য রচিত হয়েছে এ বইয়ে। বাউলদের অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য-সাহচর্য তাঁকে লালনকে চিনতে-বুঝতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে। অনুরাগের সঙ্গে অনুসন্ধিৎসা এবং প্রীতির সঙ্গে কৌতূহলের যোগ স্থাপিত হলে তাঁর লালনচর্চা আরো সার্থকতা লাভ করবে। আমরা অপেক্ষা করবো সেই প্রাজ্ঞ সত্যনিষ্ঠ লালন-গবেষকের জন্যে, যিনি নতুন তথ্য ও ভাষ্যে লালনকে পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপিত করবেন একদিন।
আশা করি, আজাদুর রহমান তাঁর লালনমনস্কতার জন্যে অভিনন্দন পাবেন বাউলভুবনের মরমী মানুষ ও লালন-অনুরাগী সুধীজনের কাছ থেকে। এ নবীন লালনভাবুকের জন্যে আমার আন্তরিক শুভকামনা রইলো। আলেক সাঁই।
কম দেখান